বিশেষ প্রতিবেদক:

এক কোটি ইয়াবা লুটকারী মিজান বন্দুক যুদ্ধে নিহত হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে তার সহযোগীরা। এ ঘটনার পর তারা সটকে পড়ে নিরাপদে। লুট হওয়ার ইয়াবার কিছু অংশ ওই সহযোগীরা গোপনে বিক্রি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যান।

মিজান ভারতে পালিয়ে গেলেও ইয়াবা বিক্রি করে বেশ বিলাসী জীবন যাপন করতে দেখা যায় তাদের। অনেকেই ইয়াবার টাকায় গাড়ি-বাড়িসহ নানা সম্পদের মালিক হওয়ার গুঞ্জণ উঠে এলাকায়। মিজানের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল তাদের। মিজান বেনাপোলে আটক হওয়ার পর অস্বস্তি বেড়ে যায় সহযোগীদের। পুলিশ মিজানকে নিয়ে ইয়াবা উদ্ধারে গেলে ওই সহযোগীরাই সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা চালায়। এতে গোলাগুলিতে মিজান গুলিবিদ্ধ হয়। কিন্তু বেঁচে যায় তার সহযোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিজান, তার ভাই কায়সার, লুটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ইফতেখার খান বাবু পালিয়ে যাওয়ার পর তার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল সহযোগী ঘোনারপাড়ার এলাকার আবু তৈয়ব, মো. হেলাল, কাশফিয়া, আবু ছৈয়দ কোম্পানীর ছেলে আব্দুল মজিদ, বাসটার্মিনাল এলাকার শহীদ ও বোরহার, টেকপাড়ার ল্যাংঙ্গার পুত্র হোসেন মাঝু, আমেনা খাতুন এলাকার মুবিনের পুত্র নাসির মিয়া, তার ভাই আলাউদ্দিন, বানু প্রকাশ বানুনীর পুত্র হারুন, খুরুস্কুলের আমির হোসেন, মোজাম্মেল, ফারুক, মোস্তাক, ফিরোজসহ আরও কয়েকজনের।

এককোটি ইয়াবা লুটের সাথে তারা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তার মধ্যে দুই সহযোগী ফিরোজ ও তার ভাই মোস্তাককে ২৩ ফেব্রুয়ারি দুই লাখ পিস ইয়াবাসহ আটক করে পুলিশ। লুটেরা দলের অন্য সদস্যরা এখনও পলাতক রয়েছেন।

মিজানের সাথে প্রায় দুই দশক ধরে গভীর সম্পর্ক রয়েছে আবু তৈয়বের। তারা দুজন মিলেই নানা অপকর্ম করে বেড়াত। ইয়াবা ব্যবসার সাথে আবু তৈয়বের সখ্যত পুরোনো। আবু তৈয়বের পিতা ছিল একটি মার্কেটের সামান্য দারোয়ান। অভাবের সংসারে তাদের সংসারে ভাগ্য ফেরে ইয়াবার আশির্বাদে। মিজান পালিয়ে যাওয়ার আগে একমাস আবু তৈয়বের বাসায় আত্মগোপনে ছিল বলে গুঞ্জন চলছে সর্বত্রে। ইয়াবা লুটের ঘটনায় মিজানকে যখন পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে তখন মিজান বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে আড়াল করেন।

এর অংশ হিসেবে কক্সবাজার শহরের ৯নং ওয়ার্ড ঘোনার পাড়া এলাকায় মো. তৈয়বের বাসায় প্রায় একমাস আত্মগোপনে থাকেন তিনি। আত্মগোপনের বিষয়টি একটি গোপন সূত্রে জানা গেছে। তৈয়বও একটি ইয়াবা মামলার দুই নাম্বার আসামী।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি শহরের বৌদ্ধমন্দির এলাকা থেকে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ তৈয়বের ছোট ভাই আবু তাহেরকে গ্রেপ্তার করেছিল সদর থানা পুলিশ। ওই মামলায় আবু তৈয়ব দুই নাম্বার আসামী। তৈয়ব ঘোনার পাড়া এলাকার আবুল হাসেম ওরফে বার্মাইয়া হাশেমের ছেলে। তবে এই মামলায় জামিনে রয়েছে তৈয়ব। তৈয়ব ও তার ভাই তাহেরকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া লুট হওয়া ইয়াবা থেকে মিজান এক লাখ বিক্রি করতে দেয় টেকপাড়া হাঙর পাড়া এলাকার ল্যাংঙ্গার পুত্র হোসেন মাঝিকে। ইয়াবাগুলো বিক্রির পর টাকা মিজানকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এতে ভাল কমিশন পায় হোসেন মাঝু। মিজানের নির্দেশ মতোই সে সব কাজ করতো। লুট হওয়া ইয়াবা কোথায় ছিল সে বিষয়টিও জানত হোসেন মাঝু। এক বছর আগেও হোসেন মাঝু ছিল ভবঘুরে। তবে মিজানের অনুগ্রহে তার এখন আলিশান বাড়ি। সম্প্রতি ইয়াবার টাকা কিনেছেন দুইটি ঢাম্পার। বন্দুকযুদ্ধের পর বেশ সতর্কে পা ফেলছেন তিনি।

মিজানের অন্যতম সহযোগী টেকপাড়া আমেনা খাতুন এলাকার মুবিনের পুত্র নাছির মিয়া ও তার ভাই আলাউদ্দিন। তাদের পবিবারের সবাই ইয়াবা ব্যবসার সাথে দীর্ঘদিন জড়িত। কালো টাকার গরমে তাদের চালচলন ছিল বেপরোয়া। সাধারণ মানুষ সবসময় তাদের কাছে নিগৃহীত হতো। মিজানের ছত্রছায়ায় থেকে গোপনে ইয়াবা পাচার করে আসছে ওই দুই সহোদর। এদেরও মিজান লুট হওয়ার ইয়াবার লাখ পরিমাণ বিক্রি করার দায়িত্ব দেন। সেই ইয়াবা বিক্রি করে অধিকাংশ টাকা হজম করে তারা। বর্তমানে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের সিন্ডিকেটর সক্রিয় সদস্য মো. হেলাল ও কাশফিয়া।

মিজানের আরেক বিশ্বস্ত সহযোগী টেকপাড়ার বানুর পুত্র হারুন। তার পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িত। ইয়াবার সাথে জড়িয়ে হারুনের ভাগ্য বদলে যায়। একসময় না খেয়ে থাকা হারুন এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক। চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে তার দহরম মহরম সম্পর্ক। লুট হওয়া ইয়াবা বিক্রির দায়িত্ব তার কাধেও আসে। সততার সাথে সে ইয়াবা বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লুট হওয়া ইয়াবার আদৌপান্ত তার জানা।

তাই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন, লুট হওয়া ইয়াবা উদ্ধার, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের শিগগিরই আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন সুশীল মহল।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, মিজানের সাথে কারা জড়িত তা বের করা হবে। ইতিমধ্যে ইয়াবা লুটের ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে ইয়াবাসহ। তার সাথে যারা নিয়মিত চলাফেরা করত সবাই নজরদারীতে রয়েছে। অনেকজনকে চিহ্নিতও করা হয়েছে। কোনো মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্যঃ গত ৮ ফেব্রুয়ারী কক্সবাজার শহরের মাঝেরঘাটে আবু ছৈয়দ কোম্পানির জেটিতে ইয়াবার বিশাল চালান লুটের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে মিজান ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেই ইয়াবাগুলো বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে।

বিভিন্ন সুত্রের দাবী, দালালের মাধ্যমে ইয়াবাগুলো ২৪ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছিলো। ফিশিং বোটে করে একটি শক্তিশালী ইয়াবা পাচারকারী সিন্ডিকেট বিশাল চালানটি এনেছিলো। তাদের মতে, সেখানেই ইয়াবার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি। এ ঘটনায় কক্সবাজার শহরজুড়ে আলোচনার ঝড় ওঠলে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে কক্সবাজার শহরের বিমানবন্দর রোডস্থ একটি গণপরিবহনে করে চট্টগ্রাম চলে যায় মিজান। ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করার পর একইদিন রাতেই বিমানযোগে ভারত পালিয়ে যায়।

সর্বশেষ ১৭ জুলাই বেনাপোলের ইমেগ্রেশন পুলিশ মিজানকে আটক করে কক্সবাজার জেলা পুলিশকে অবগত করে।

পুলিশের একটি টিম গিয়ে মিজানকে কক্সবাজার এনে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক সোমবার (২০ জুলাই) ভোররাতে মাঝেরঘাটস্থ খুরুশকুল ব্রীজ এলাকায় লুট হওয়া ইয়াবাগুলো উদ্ধারে যায় সদর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ।

ওসির দাবী, মিজানকে নিয়ে ইয়াবা উদ্ধার অভিযানে গেলে পূর্ব থেকে উৎপেতে থাকা তার সহযোগিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। ইয়াবা কারবারিদের এলোপাতাড়ি গুলিতে পুলিশও পাল্টা গুলি ছুঁড়ে।
মাদক কারবারিরা গুলি ছুঁড়ে মিজানকে ছিনিয়ে নেওয়া চেষ্টাকালে গুলিবিদ্ধ হয় মিজান। এসময় পুলিশের পাল্টা গুলিতে সহযোগিরা পালিয়ে যায়।
পরে ঘটনাস্থল থেকে ১০ হাজার ইয়াবা, একটি দেশিয় বন্দুক ও এক রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। গুলিবিদ্ধ মিজানকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক ‘মৃত’ ঘোষণা করে।

সূত্র: ভয়েস ওয়ার্ল্ড ২৪

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন